ফটো গ্যালারি

শনিবার ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে পারেননি- সংকট কাটাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক আজ

পাওনা টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি বন্ধ পাইকারদের

পাওনা টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি বন্ধ পাইকারদের \

এওয়ান নিউজ: কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানির লক্ষ্যে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন দেশের পাইকাররা। শনিবার নির্ধারিত দিনে কোনো আড়তদার লবণ মাখানো চামড়া বিক্রি করেননি।

তবে দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে ট্যানারি মালিক ও তাদের প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়েছেন। তারা পোস্তায় একাধিকবার সরেজমিন গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। এ সময় আড়ত মালিকরা বিক্রিতে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। আর বিকালে এক জরুরি বৈঠকে পাওনা টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ‘বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ এ সংক্রান্ত জরুরি বৈঠকে বসবে। সেখানে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের বকেয়া ৩শ’ কোটি টাকা পাওনা সমাধান এবং বিদেশে ওয়েট ব্লু ও লবণযুক্ত চামড়া রফতানির বিষয়ে সমাধান দেয়া হবে।

এদিকে সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছে ৩২ বছরের ইতিহাসে চামড়ার মূল্য এত কমেনি। এর পেছনে একটি চক্র কাজ করতে পারে। সে চক্রের সন্ধান করতে একাদিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এবারের মতো কোরবানির পশুর চামড়ার দামের বিপর্যয় বিগত সময়ে হয়নি। মূলত ট্যানারি মালিকদের অবহেলা ও মূল্য নির্ধারণের কারণে এ অবস্থা হয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়া কেনাকাটায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছেন। কারণ সরকারকে ম্যানেজ করে ট্যানারি মালিকরা পশুর চামড়ার নামমাত্র মূল্য বেঁধে দিয়ে এ ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। জানা গেছে, ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুটের মূল্য বেঁধে দেয়া হয়েছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। আর ২০১৯ সালে গরুর চামড়ার মূল্য বেঁধে দেয়া হয় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। অর্থাৎ এ ৭ বছরে গরুর চামড়ার দাম কমানো হয়েছে বর্গফুটে ৪০ টাকা। দাম বেঁধে দেয়ায় ট্যানারি মালিকরা লাভবান হয়েছেন। কিন্তু লোকসান গুনতে হয়েছে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের।

জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ট্যানারি মালিকরা নিয়ম বেঁধে কাঁচা চামড়া কেনাকাটা না করলে রফতানির ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হবে। যেভাবে চামড়া নষ্ট হয়েছে সেটি কাম্য নয়। এজন্য আজ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। এরপর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন বিদেশে ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানি নিষিদ্ধ ছিল। একমাত্র ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া ট্যানারি মালিকরা রফতানি করছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির সময়ে এ শিল্পের অবস্থা অনেক ভালো ছিল। ট্যানারি মালিকদের বাইরেও ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ওয়েট ব্লু চামড়া বিদেশে রফতানি করতেন।

কিন্তু ট্যানারি মালিকদের চাপে তৎকালীন সরকার এটি বন্ধ করে দেয়ায় হাজার হাজার চামড়া ব্যবসায়ী পথে বসেন। এক এক করে অনেক ট্যানারিও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গুটিকয়েক ট্যানারির হাতে চলে আসে চামড়া রফতানি। বর্তমান বিদেশে প্রতি বছর চামড়া রফতানি খাত থেকে আয় হচ্ছে ২ হাজার কোটি টাকা। আর রফতানির সঙ্গে জড়িত আছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি ট্যানারি। পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন এসব ট্যানারির মালিকরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে প্রতি ফুট গরুর চামড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দাম বেঁধে দেয়া হয়। এরপর পরবর্তী বছরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৬ সালে গরু প্রতি বর্গফুটের সর্বনিু দাম ছিল ৫০ টাকা। আরও ২০১৮ ও ২০১৯ সালে এবারের দামই নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দর ঠিক করে দেয়া হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। দাম বেঁধে দেয়ার নামে এভাবে কৌশলে কমিয়ে আনা হয় মূল্য।

এদিকে আড়তদাররা অভিযোগ করেছেন, তারা পুরনো পাওনা পাননি। ৯০ শতাংশ ট্যানারি মালিক ১ টাকাও বকেয়া পরিশোধ করেননি। ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৭শ’ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে ট্যানারি মালিকদের।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদ বলেন, এবার কোরবানির চামড়া কেনায় ২২০ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় ২৭ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম বলেন, কোরবানির চামড়া কিনতে এবার ১৩০ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান বলেন, চামড়া কিনতে এবার প্রায় ২শ’ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে রূপালী ব্যাংক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব টাকা পাওয়ার পরও ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ করেননি। এ সুযোগ নিয়ে আড়ত মালিকরা নিজেদের মতো করে চামড়া কিনেছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি হাজী মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়ে রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক আছে। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার যেহেতু কাঁচা চামড়া রফতানির ঘোষণা দিয়েছে এর বাস্তবায়ন কিভাবে করবে সেটি দেখার অপেক্ষায় আছেন অনেক পাইকার। এর আগে চামড়া বেচাকেনা বন্ধ।

তবে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, এমনও সময় গেছে তাদের অগ্রিম টাকা দেয়া হতো। এখন রফতানির আশায় আড়তদাররা এ অবস্থান নিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন। আমি মনে করি, তারা ব্যবসায়িক আচরণ আমাদের সঙ্গে বজায় রাখবেন।

ট্যানারিতে চামড়া বিক্রি না করার ঘোষণা : শনিবার জরুরি বৈঠক করে কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া শত শত কোটি টাকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তারা চামড়া বিক্রি করবেন না। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে যে পাওনা টাকা রয়েছে, তা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নতুন ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেব না। রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

শুধু ঢাকার লালবাগের পোস্তার ব্যবসায়ীরাই ট্যানারি মালিকদের কাছে অন্তত একশ’ কোটি টাকা পান জানিয়ে তিনি বলেন, সেই হিসাবে সারা দেশে অন্তত ৪শ’ কোটি টাকার উপরে বকেয়া রয়েছে।’

দেলোয়ার দাবি করেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে পড়ার কারণে তারা রফতানির বাজার খুঁজছেন। আমাদের জিম্মি করে তারা ব্যবসা করতে চাচ্ছে। সেই জিম্মি দশা থেকে বের হওয়ার একটা সুযোগ আমরা পেয়েছি। তারা যদি টাকা দেয়ার একটা প্রতিশ্রুতি দেন এবং আগামী দিনে ব্যবসা কিভাবে হবে সেটা নিয়ে আলোচনা করেন, তবেই অচলাবস্থার অবসান হবে।

মন্তব্য করুন

আরো সংবাদ