ফটো গ্যালারি

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান

শাড়ি এবং নারী- শরীরকে ভোগের বস্তু-রুপে উপস্থাপন প্রসংগে

শাড়ি এবং নারী- শরীরকে ভোগের বস্তু-রুপে উপস্থাপন প্রসংগে \

অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ৩০ আগস্ট ২০১৯ এর প্রথম আলোতে প্রকাশ পাওয়া লেখনি ‘শাড়ি’ প্রবন্ধ নিয়ে ইতিমধ্যে প্রিন্ট ও সামাজিক মিডিয়াতে আলোচনা- সমালোচনার প্রবল ঝড় বয়ে গেল। মিম, ট্রল, বিদ্রুপ- পূর্ণ ফেসবুক স্ট্যাটাস আর প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রবন্ধ লিখে ভরে দিলেন তরুণ নারীবাদীরা। এতে আবার মনক্ষুন্ন হয়ে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন কিংবদন্তী লেখকের শিষ্য, বন্ধু ও অন্য ভিন্ন- মত পোষণকারী পাঠকেরা যাদের মধ্যে নারী- পুরুষ উভয়েই আছেন। একটু নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছেন অনেক প্রথম জেনেরেশন নারীবাদী ও সিনিয়র পুরুষ বুদ্ধিজীবিরা। স্পর্শকাতর একটা বিষয়ে হয়ত জড়াতে চাননা, তবে চারিদিকে দোষ- বিদ্রুপ ছুড়াছুঁড়িতে এই লেখিকার কাছে মনে হয়েছে যে কিছু বিশ্লেষণ মূলক ব্যাপার আছে যেগুলো পরিষ্কার করার বুদ্ধিবিত্তিক ও সামাজিক দায়িত্ব হয়ত তার উপর বর্তায়। তবে এটা পরিষ্কার করে নিতে চাই যে, এই লেখনির প্রসংগ শুধু অধ্যাপক সায়ীদের ৩০ আগস্টের লেখা, তার অন্য লেখা না।

নারীবাদীরা যে পইন্ট এ খুন্ন হয়েছেন, সেটাকে নারীবাদের ভাষায় বলে অবজেক্টিফিকেশন। অর্থাৎ, নারীকে কেবল একটি ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপিত করা। আদিবা হায়াত ঋশোভা ২৯ শে আগস্টে ছাপা দৈনিক ‘ দি বিজনিস স্ট্যান্দার্ড’ এ লিখছেন, ” Is this all there is to being a woman? Her education, her career, her achievements essentially mean nothing if she dresses herself up in anything other than a saree, is less than 5 foot 5 or 6 inches or hail from any part of the world other than the Indian sub-continent.” অতএব নারীর শাড়ি ও শরীরকে এইভাবে উপস্থাপন কেন? তার শিক্ষা, তার যোগ্যতা, অর্জন, এগুলো কি কিছুই না?”

আরেক টগবগে তরুণ নারীবাদী লিখছেন,
” আমার বরং ইচ্ছে করছে পুরুষের লুঙি নিয়ে লিখতে, লুঙি শ্রেণী নির্বিশেষে কি কিভাবে যৌনময় হয়ে উঠে, আর কিভাবে সেটিকে উঠিয়ে পুরুষ যৌন কাজ গুলো করতে পারে, দেখাতে পারে, এ নিয়ে রগরগে লেখা লিখে যৌনবাদী পুরুষতন্ত্রকে মৌজমাস্তি দেওয়াই যায়? মধ্যবিত্ত নয় বরং পুরুষ মাত্র উপমহাদেশের শরীরে, পিটা শরীরে লুঙি কি কি যৌনকরণ ঘটায় দেখতে ভাল লাগে। হাফপ্যান্ট পরে পুরুষ কিভাবে নিজেকে বালখিল্য করছে এ নিয়ে এক্টি রচনা রচিত করাই যায়। “

লেখাতো যায় বইকি। উক্ত লেখিকা বাঙালী পুরুষের যৌন আচার-ব্যবহারকে একটি বিষয় করে সেটা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেই পারেন। কারো অনুমূতি নেওয়া বা আগে থেকে জানান দেওয়ার তো কিছু নেই, তবে এতটুকু বলতে চাই যে, যদি শক-ইফেক্টের জন্য আক্রমনক্ত মন্তব্য করে থাকেন, তাহলে আক্রমণটা অযাচিত ও অপরিমার্জিত। কেননা অধ্যাপক আবু সায়ীদ তার মূল লেখাতে নারীর জামা উচু করে যৌনতা প্রকাশ নিয়ে কিছু লেখেননি। এমন লেখা লিখলে দারুণ অশ্লীল ঠেকত সবার কাছে, নান্দনিকতত্ত্ব বিষয়ক লেখা হিসেবে গণ্য হত না। তাই আক্রমণ করলেও পরিমিতি বোধ বড় প্রয়োজন।

অন্যদিকে আরেক আবেগময় লেখিকা বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত হয়ে লাঠিয়াল বাহিনি তৈরী করার পরিকল্পনা করছেন। তর্ক- বিতর্ক নয়, লাঠি দিয়েই উনি এই ঝামেলার সুরাহা করবেন বলে জানান দিচ্ছেন। ইনি লিখছেন, “আর আশী বছরের উপরে যে সব লুচ্চা পুরুষ এখনো নারীর শরীর নিয়ে বিশ্লেষণে নামেন, তারা বাঙালী পুরুষের গুরুতে পরিণত হন।
যে শিষ্যকূল গুরুকে রক্ষার জন্য মাঠে নামিয়াছে তাদেরসহ শক ট্রিটমেন্ট দেওয়া হইবে। কিছু নারীও এদের মধ্যে আছে। ভাবখানা হল, কর্তায় কইসে সুধীরভাই, আনন্দের আর সীমা নাই। ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি বাশ দিয়া পিটাইয়া লাল করা হবে। সংগে আলুপ্রিন্ট শাড়ি আর কলসি ফ্রি।”

দেখাই যাচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক মানসিকতার প্রবল ছাপ ইনার মস্তিষ্কে বিরাজ করছে, যেখানে শারীরিক হানাহানি এবং লাঠির শ্রেষ্ঠতাকেই সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হয়। তবে আমি মনে করি উনার এই ধরণের লেখাতে নারীবাদ নিয়ে ধারণাটা ক্ষুন্ন হয় এবং ইনি প্রকৃত নারীবাদীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না।

এই লেখিকারা কেন এত আক্রশে-ভরা স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেটা বুঝার চেষ্টায় অধ্যাপক সায়ীদের লেখাকে একটু উদ্ধৃত করা যেতে পারে:

“এখানে আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল।”

অধ্যাপক সায়ীদের পক্ষের লেখকমন্ডলী মন্তব্য করছেন যে, লেখাটা নন্দন-তত্ত্ব বিষয়ক, ফোকাস্টা হচ্ছে বাংলার নারী-শরীর, এবং তত অবয়বে পরিধেয় হিসেবে শাড়ির সর্বোতকৃষ্ট মানানসইতা। এখানে লেখক নারীর পেশা, বৃত্তি, বা জীবনের উন্নতি নিয়ে লিখছেননা, বিষয়বস্তুটা ভিন্ন: কেবল নারী শরীরের অবয়ব আর পোশাকের নন্দন-তত্ত্বতে সীমাবদ্ধ। প্রবন্ধটা হচ্ছে নান্দনিক ও শৈল্পিক পরিধেয় নিয়ে। তাই অব্জেক্টিফিকেশনের প্রশ্ন এখানে উঠেনা। ব্যাপারটা এতটুকুই।

তবে ব্যাপারটা এতটুকুই নয়। নারীবাদীরা মনে করছেন যে, নারী-শরীরকে এই ঢংগে চিত্রায়িত করাতে সেটাকে একটা উপভোগের বস্তু হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ অবজেক্টিফিকেশন (‘objectification’) এর দোষে লেখটা দুষ্ট।

অবজেক্টিফিকেশন তখনই হয় যখন আমি একটি শরীরকে কেবল ভোগের বস্ত হিসেবে দেখি, একটি শরীরের পেছনে যে পূর্ণাংগ মানুষ্টি আছেন, তার যে সামগ্রিক সত্ত্বা বিরাজ করছে, সেটা যদি নগণ্য হয়ে ওঠে বা হারিয়ে যায়।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, অব্জেক্টিফিকেশন বা যে কোন শরীরকে একটি ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটি ব্যাপার কারণ প্রকৃতার্থে একজন মানুষ বা মানবীর যে সার্বিক মানবিক সত্ত্বা ও গুণাবলী, সেইগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে কেবল কাম বা শ্রম বা উতপাদনের বস্তু হিসেবে মানবশরীর দেখা হয়। এই প্রক্রীয়াতে একটি সংক্ষিপ্তকরণ পদ্ধতি কাজ করে থাকে। একজন মানুষের বিশালতাকে যেন ছেটে ফেলা হয়। পিতৃতান্ত্রীক সমাজব্যবস্থার নানান পর্যায় নারীকে এইভাবে দেখা হয়ে থাকে, কেবল সন্তান উতপাদনের বস্তু বা কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে। মাত্র শ- দেড়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণকায় মানুষদেরকে ক্রিতদাসে পরিণত করে নিছক উতপাদনের বস্তু হিসেবে দেখা হয়েছে।

এই প্রবন্ধে কি অধ্যাপক সায়ীদ নারীকে উপরে- বর্ণিত অর্থে কেবল ভোগ- বস্তু হিসেবে দেখিয়ে খাট করেছেন? একটি শরীর- যে কোন শরীর, হোক সে ফুল, পাতা, মেঘ, ঘোড়া, হাতী, মানব- শিশু, পুরুষ, নারী- একটি শরীরকে কি রংতুলি রেখা বা পেন্সিল স্কেচ দিয়ে শিল্পিরা সব সময়ে আকছেন না? তাহলে চিত্র হিসেবে আকা বা শব্দে আকা কি দোষের কিছু? এটাতে কি ‘ অব্জেক্টিফিকেশন’ হয়ে গেল?

অধ্যাপক আরও লিখছেন: ‘নারী শরীরকে যতটুকু অনাবৃত রাখলে তা সবচেয়ে রহস্যচকিত হয়ে ওঠে, পোশাক হিসেবে শাড়ি তারই উপমা।’

এই লেখাতে নারী- শরীরের নান্দিকতার যে আবেদন সৃষ্টি হয়েছে সেটা কি আধুনিক বা মুক্তমনা মানুষের কাছে দোষের কিছু? আমরা জানি যে ধর্মের নামে যে গোড়ামী ও সনকীর্ণতার আবহাওয়া আমাদেরকে চারিদিক থেকে ঘিরে, স্বাধীনতার অক্সিজেনকে শুষে, আমাদের গ্রাস করতে চলেছে, সেটা কেমন বিপজ্জনক। সমস্ত ভারত উপমহাদেশে আমরা ধর্ম- গোড়ামীর বিরুদ্ধে এখন লড়াইয়ে নেমেছি। নারী-শরীরকে কয়েক কাথায় মুড়িয়ে আবৃত করে রাখতে হবে, বা শরীর নিয়ে কথা বলা যাবে না, এটা গোড়া চরম- পন্থীদের কথা। প্রগতিশীলরা এমন চিন্তা কেন করবেন?

অন্য দিকে বহির্বিশ্বের অনেক সরিয়াস নারীবাদীরা বিশেষ করে পষচীমা নারীবাদীরা সচেতন ভাবে প্রসাধনী ব্যবহার বা স্কার্ট পরা থেকে বিরত থাকেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে যুগ যুগ ধরে পুরুষ সমাজ তাদেরকে যে উপভোগের বস্তু হিসেবে দেখে এসেছে সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
তবে কোন নারী যদি সাজসজ্জা করে থাকেন, সেটা তার অধিকার, তার মানে এই নয় যে তাকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে হবে। এই ব্যাপারেও বিশ্বের সচেতন নারীরা সোচ্চার। তবে এখানে মন্তব্য করব যে, প্রত্যেকটি পিতৃতান্ত্রীক সমাজ- ব্যবস্থায় তরুণ (এবং বয়স্ক!) নারীদের উপর একটি অদৃশ্য চাপ থাকে সাজ-সজ্জার প্রচলিত নিয়ম- নীতি মেনে চলার, তবে পরিধেয়র ব্যাপারে পুরুষরা অপেক্ষাকৃত স্বাধীন। একটি সমাজ মানসিক ভাবে যত পশ্চাদ হবে, নারীর পরিধেয়র স্বাধীনতা ততটা কম হবে।

বর্তমান বাংলাদেশী সমাজে আমরা এখনো নারীবাদ নিয়ে যুদ্ধ করছি। এখানে সচেতন ভাবে হোক বা অবচেতন ভাবেই হোক, আমরা টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষমতাশীনদের কাছে গ্রহণযোগ্য, সামাজিক ভাবে উপযুক্ত এবং পুরুষের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় তবে মার্জিত বসনের নিয়ম- নীতি মেনে চলছি।

নারীবাদীরা মানুষ হিসেবে সমতার দাবী নিয়ে লড়াই করে এসেছেন সেই আঠারো শতাব্দী থেকে। বাংলাদেশে অবহেলিত হলেও বিশ্বে একটি আধুনিক দর্শন হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীবাদ ঠিকই তার স্থান পেয়ে গেছে। ‘জেন্ডার স্টাডিজ’ এবং ‘উইমেন স্টাডিজ’ নিয়ে আধুনিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আলাদা বিভাগই আছে। তাই এমন মন্তব্য যে যারা পুরুষের সমাদর পান না তারাই নারীবাদী হয়ে উঠেন, চরম
মূর্খতার প্রমাণ। এই বেচারারা কোন ভাল বিদ্যালয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা করেন নি, এটা বলতেই হয়।

শাড়িতে নারী- শরীরের শ্রি ফুটিয়ে তোলার প্রসংগে বলব যে, আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে আমার বান্ধবীরা যখন আমাকে শাড়ি পরতে শেখান তখন দেখিয়ে দেন কিভাবে আচলের কাপড়টা টান টান করে ধরে উপরের অংশটা অপর কাধে মেলে দিতে হয়। তারপর তিনচারেক ভাজ করে বুকের উপর মেলে আবারো ওই একই কাধে সেফটিপিন দিয়ে আটকে দিতে হয়। শাড়ির নিজের যেহেতু কোন আকার নেই, এই পরিধেয়টা নারীর শরীরের আকৃতি ধরেই নিজেকে বিস্তৃত করে। এবং এটাই হচ্ছে শাড়ীর গুণ। সালোয়ার কামিজে যেভাবে ফিটিং নিয়ে ঝামেলা পোহাতে হয়, শাড়ীতে তা নয়, বরঞ্চ শরীরের সাথে মিশে গিয়ে এটা শরীরের অবয়ব কে তুলে ধরে। এই ব্যাপারটাই অধ্যাপক সায়ীদ তার লেখায় বোঝাতে চেয়েছেন।
কোমরটা ঘিরে যে প্যাচ দিয়ে সামনের দিকে কুচি দেওয়া হয় সেটাও একটা কলা, যেটা শেখার জন্য প্রত্যেক যুবতী উতসুক থাকে। আমি নিজেও এটা পর্যায়ক্রমেই শিখেছি এবং এই শিক্ষাটা অনেক পরেই হয়েছে। এটা যে নিখুঁত কলা এটা এইভাবে বোঝা যায় যে, পশ্চীমা নারীরা যখন মাঝে মধ্যে শাড়ি পরেন, তখন শাড়ির এই অংশটা এতটা নান্দনিক ভাবে পেচানো হয় না, যতটা আমাদের তরুনীরা পরলে হয়। একজন প্রবীন প্রাজ্ঞজন ( কবি ফরিদা মজিদ) আমাকে এই নিখুঁত কলা শিখিয়েছেন। শাড়িকে কুচি দেওয়ার আগে এই ভাবে মেলে ধরতে হয় যে, সামনের অংশটা একটা ‘ভি’ আকার ধারণ করে। এতে মাজা ও কোমরের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। এই বিস্তারিত খুঁটিনাটি বর্ণনা দিয়েছি এটা বোঝাবার উদ্দেশ্য যে, আধুনিক শহুরে নারীরা সচেতন ভাবে শাড়ি পরেন শরীরের আকৃতিকে ফুটিয়ে তোলার দৃষ্টিকোণ থেকে। ফ্যাশনাবেল শাড়ি এভাবেই পরা হয়। অন্যভাবে স্রেফ পেচিয়ে যদি কেউ শাড়ি পরে সেটা ফ্যাশান- সচেতন নাগরিক সমাজে দৃষ্টি- কটু হবে। তরুনীদের জন্য এটা অবশ্যই সত্য। এই অলিখিত নিয়মগুলী ধরেই আমরা চলছি। এইগুলোকে অস্বীকার করা বৌদ্ধিক সততার অভাব থেকে এসেছে। এই সততার অভাব ততটা ইচ্ছাকৃত নয়, এটা আবার বৌদ্ধিক স্বচ্ছতার অভাব থেকে হয়েছে। আমরা এ দেশের নারীবাদীরা সবাই পশ্চীমা নারীবাদতত্ত্ব এবং প্রচলন দ্বারা প্রভাবিত, কারণ উপায় নেই: জ্ঞান- বিজ্ঞান- দর্শন, সব আসনই পশ্চীমারা গত কয়েক শত বছর ধরে দখল করে আছেন, আর আমাদের উচ্চ- শিক্ষার বই- পুস্তক তো তাদেরই লেখা। আর দর্শন হিসেবে নারীবাদ তো প্রথমে ইউরোপ- আমেরিকাতেই জন্ম নেয়। তাই এই প্রভাবগুলো আসবেই, তবে আমরা নিজেরা সামাজিক বিবর্তনের জায়গায় কোথায় অবস্থান করছি সেটা তো বুঝতে হবে। এই বোধের জন্যও আমাদেরকে এই দেশে নারীবাদ এবং তার চর্চা নিয়ে বিশ্লেষণ- মুলক আলোচনায় নামতে হবে।

এইবারে আসি অধ্যাপক সায়ীদের লেখার সেই উদ্ধৃতে যেখানে উনি বলছেন যে অনেক জাতির তুলনায় বাঙালী নারী উচ্চতায় অপেক্ষাকৃত কম হওয়ার জন্য একমাত্র শাড়িতেই তাকে সবচেয়ে নান্দিক দেখায়, অন্য পরিধেয়তে এতটা ভাল লাগে না। আমি মানি এই কথাগুলো অপেক্ষাকৃত ভাবে স্পর্শকাতর শোনায়। তবে এই কথাগুলোতে কি নিজ জাতির প্রতি কোন হীনমন্যতা প্রকাশ পায়? আমাদের জাতীয় গড় উচ্চতার বাপারটা তো একটা বাস্তবিক ব্যাপার। তবে অপেক্ষাকৃত অল্প উচ্চতা ভাল, না মন্দ, সেটা হচ্ছে আমাদের নিজস্ব অভিমত। অনেক নারীবাদীরা নিজেদের পশ্চীমা পোশাক পরা ছবি ফেসবুকে দিয়ে প্রতিবাদ করছেন যে, এই পোশাকে কি তাদের ভাল লাগছেনা?
উত্তরে বলতে চাই যে, ভাল লাগার বিষয়টা নিজের কাছে। একজনের কাছে পশ্চীমা পোশাক কে সর্বোচ্চ সুন্দর লাগতে পারে, আবার আরেক জনের কাছে শাড়ি সব চেয়ে সুন্দর পোশাক হতে পারে। মতের ভিন্নতার জন্য কাউকে আক্রমণ করার কিছু নেই। আবার আধুনিক নারীর কাছে সব সময় সুন্দর লাগাটা মূখ্য নয়, নিজের আরামদায়ক চলাফেরাটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। তাই আধুনিক নারীরা সালোয়ার কামিজ, পশ্চিমা পোশাক, সবই পরে থাকেন। অনেক সময় তরুনীরা কোন বিশেষ অনুষ্ঠান না হলে শাড়ি পরেন না।

তবে আমি দেখেছি যে, আমার ছোট বান্ধবীরা যে কোন অনুষ্ঠানের সময় আমাকে বলবেই, ‘ আপু শাড়ি পরে আসছ তো?’ এতে আমি বুঝি আধুনিক বাঙালী সমাজে যুবতী ও তরুনী নারীর কাছে এবং পুরুষের কাছেও শাড়ির কি মহিমা এখনো রয়েছে। আমি মনে করি অধ্যাপক সায়ীদ তার সংশ্লিষ্ট উদ্ধৃতিতে সাধারণ মানুষের এই অনুভূতি বা চিন্তাকেই তুলে ধরেছেন।

আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করতে হয় যে কোন কোন জায়গায় অধ্যাপক সাহেব প্রবীন বয়স সর্তেও এমন লেখা কি ভাবে লেখেন, এবং এটা তার মস্তিষ্কের বিকারের পরিচয় এমন মন্তব্য করা হয়েছে। এই মন্তব্যগুলো বয়স-বৈষম্যে দুষ্ট। বয়সের সাথে যে নান্দিক উপলব্ধিগুলো হারিয়ে যাবে, বা যৌন- আবেদন সচেতনতা নির্লিপ্ত হয়ে যাবে, এই ধরণের চিন্তা কিন্তু ভিত্তিহীন, বৈষম্য- মূলক এবং আপত্তি- জনক। এটা দিয়ে বোঝা যায় সমাজে আমরা বয়স্কদেরকে কি স্থান দিচ্ছি। খুব জোর যা হয় সেটা হল যে বয়সের সাথে আগের মত জৈবিক স্পৃহাগুলী কাজ করে না। তবে নারীরা নিজেও যুগ যুগ ধরে বয়স- বৈষম্যের শিকার হয়ে এসেছেন, একটু বয়স বাড়লেই সমাজের কাছে তারা মূল্য হারিয়েছেন, তাদের যৌনতাকে অগ্রাহ্য করা তো হয়ে থাকেই। তরুনী নারী যদি যৌন কামনার প্রকাশ করে, সে তো বেশ্যা বলে খ্যাত হবেই, বয়স্ক নারীর তো কোন কথাই নেই। এমনকি সে প্রেমে পড়েছে, এমন আভাস পেলেই পুরুষ- মহল তাকে হাসি- তামাশা এবং তিরস্কারের পাত্র করবে। এজন্যই যুগ যুগ ধরে নারীরা তাদের প্রেম- ভালবাসার অনুভূতি কে সহজে প্রকাশ করতে চাননা। আবার সারা জীবনের অবদমনের চর্চা বিবাহীত জীবনে অনেক ধরণের জটিলতাও বয়ে নিয়ে আসে। এই ব্যাপারগুলো এত সত্য যে, আমাদের সাহিত্যে সব জায়গায় প্রকাশ পেয়েছে।

নিজে এত অবদমন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে এ দেশের নারীরা বয়স্ক পুরুষদের বেলায় উদার হবেন না, এটাই স্বাভাবিক। এই উপমহাদেশের পুরুষ- নারীতে প্রেম হয়েছে, বন্ধুত্ব হয়নি। কারণ বন্ধুত্ব হয় সমান- সমানে। আর নারীদের কখনও পুরুষের সমান মনে করা হয়নি। এই অসমতা কে আধুনিক নারী মেনে নিচ্ছেন না। তবে পুরুষ- সমাজ এখনো এই অবস্থানকে মেনে নিতে পারেনি। তাই পুরুষ ও নারীর মধ্যেকার দন্ডটা আরো প্রকট- রুপ ধারণ করেছে। এখনও অনেক আধুনিক সু- শিক্ষিত ছেলেরা নিজের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন নারীকে ভয় পায় এবং তার সাথে বিবাহ- বন্ধনে জড়াতে নারাজ। অন্য দিকে নারী- বিদ্বেষ ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। ফলে আনেক সচেতন নারীরাই একা জীবন যাপন করছেন।

আসলে নারী শত শত বছর ধরে পিতৃতন্ত্র দ্বারা অবদমিত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত আর অবহেলিত হতে হতে এখন রুখে দাঁড়িয়েছে। সে চায় মানুষ হিসেবে একটি পূর্ণাংগ সত্বা হিসেবেই যেন তাকে দেখা হয়। কেবল পুরুষের বিনোদনের পাত্রী হতে সে এখন নারাজ। তাই নারীবাদীদের এই আক্রোশ।

তবে আমি মনে করি এখানে নান্দিক লেখা আর নিছক অব্জেক্টিফিকেশনের মধ্যে যে সূক্ষ্ম বিভাজনের রেখা বিরাজ করছে, সেটা নারীবাদী লেখিকাদের চিহ্নিত করা উচিত ছিল। আমার ব্যাক্তিগত অভিমত হচ্ছে যে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ নন্দন- তত্ত্ব বিষয়ক একটি রসাল, আবেদনময় আর রুচিশীল লেখা লিখেছেন, যেটাতে তার তীক্ষ্ম দৃষ্টি, এবং সুন্দরকে ধারণ, বিশ্লেষন আর ব্যপ্ত করার ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। একটা ফূর্তিময় সাহসীকতাও প্রকাশ পেয়েছে।

নারী- পুরুষের ক্রমবর্ধমান দন্ড আমাদের কাম্য নয়। প্রকৃত নারীবাদে পুরুষ- বিদ্বেষের কিছু নেই। আবার যৌনতা বা যৌন- আবেদনকে যেমন কটাক্ষ করার কিছু নেই, এটার ব্যাপারে অতিরিক্ত স্পর্শকাতর হওয়ার ও কিছু নেই। যে কোন বিষয়- বস্তু নিয়েই লেখা যায়: চিন্তা, মত ও বিষয়ের বৈচিত্র আমাদের মস্তিষ্ককে চাঙা করে, অধিক চিন্তাশীল করে তোলে। তারুণ্যময় মানবশরীর নিয়ে লেখা যায়, প্রৌঢ় বা বয়স্ক শরীর নিয়েও লেখা যায়। শুধু আমাদের খেয়াল রাখা উচিত যে, যতটা সম্ভব, আমাদের লেখনি যেন বদ্ধমূল ধারণা, বৈষম্য- মূলক চিন্তা এবং চিন্তার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকে, আমরা যেন সুস্থ সমালোচনা করতে শিখি, যেন ব্যাক্তিগত আক্রমণে না যাই। কেননা ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রমাণ করে যে আমাদের যুক্তির চেইন ভেঙে গেছে, আমরা চিন্তার জায়গায় হেরে গেছি, তা না হলে আক্রমণের কি প্রয়োজন ছিল? মনে রাখতে হবে, যে জাতি চিন্তার জায়গায় যতটা শক্তিশালী, সে ততটাই উন্নত আর স্বাধীন।

……………………….

মন্তব্য করুন

আরো সংবাদ