ফটো গ্যালারি

মনোয়ার হোসেন ॥

মুজিববর্ষ ॥ সাহিত্যের আলোয় উদযাপন

মুজিববর্ষ ॥ সাহিত্যের আলোয় উদযাপন \

সময়ের স্রোতধারায় এগিয়ে আসছে জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ। আগামী বছরের ১৭ মার্চ সেই কাক্সিক্ষত দিন। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হবে সেদিন। সেদিন থেকেই শুরু হবে মুজিববর্ষের নানা আয়োজন।

বহু বর্ণিল সেই আনুষ্ঠানিকতায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালীর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপিত হবে সাহিত্যের আলোয়। মহান নেতার জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত হবে তার জীবনের
বিবিধ অধ্যায় নিয়ে রচিত নতুন নতুন বই। শুধু কি তাই? বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ বইমেলা হিসেবে পরিচিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা উৎসর্গ করা হবে তাঁর নামে। একইসঙ্গে ২০২০ সালের আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব ঢাকা লিট ফেস্টও উৎসর্গ করা হবে শেখ মুজিবের নামে।

এই উৎসবে প্রকাশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরা হবে বঙ্গবন্ধুকে। শুধুমাত্র দেশের গ-িতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না মুজিববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা। সেই সুবাদে ২০২১ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কলকাতা বইমেলা উৎসর্গ করা হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে।

মুজিববর্ষকে কেন্দ্র করে আগামী বছরের অমর একুশে গ্রন্থমেলা পাবে ভিন্ন রূপ। ইতোমধ্যে ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তার জন্মশতবর্ষকে মূল থিম ধরেই সাজানো হবে পুরো মেলার সকল আয়োজন। প্রতিদিনের মেলা মঞ্চের আলোচনায় থাকবে শেখ মুজিবের কথা। মেলার বিন্যাসে কিংবা অঙ্গসজ্জায় ফুটে উঠবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি। সব মিলিয়ে বইমেলা হয়ে উঠবে মুজিবময়। সে আয়োজন সফলের লক্ষ্যে চলছে বিপুল কর্মযজ্ঞ। হাতে নেয়া হয়েছে জাতির জনককে নিয়ে রচিত ১০০টি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশের বিশেষ কর্মসূচী।

২০২০ থেকে ২০২২ সালের বইমেলা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হবে এসব গ্রন্থ। এসব বইয়ের মাধ্যমে উঠে আসবে বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন থেকে ছাত্র আন্দোলন, চলচ্চিত্রের প্রতি তার অনুরাগ, উপন্যাস-কবিতায় চিত্রিত জাতির জনকের রূপকসহ বিবিধ বিষয়। এর মধ্যে ২০২০ সালের গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী দিনে প্রকাশিত হবে বঙ্গবন্ধু রচিত নতুন গ্রন্থ ‘নয়াচীন ভ্রমণ’সহ ত্রিশটি বই। নয়াচীন ভ্রমণ গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায়ও বইটি প্রকাশ করবে বাংলা একাডেমি। এছাড়া ২০১৯ সালের চেয়ে বিস্তৃত পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে মুজিববর্ষের বইমেলা।

২০২১ সালের একুশে গ্রন্থমেলাটি মুজিবময় হয়ে ওঠার তথ্য উঠে আসে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কথায়। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ২৮ দিনের বইমেলার উদ্বোধনী দিন বাদে বাকি ২৭ দিনই মুক্ত মঞ্চের আলোচনায় থাকবেন বঙ্গবন্ধু। এই মেলা মঞ্চ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রকাশিত নতুন বইগুলো থেকে প্রতিদিন একটি করে মোট ২৭টি গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা হবে। সেখানে বইয়ের সূত্র ধরে উঠে আসবে বাঙালীর অবিসংবাদিত এই নেতার জীবনের নানা অধ্যায়। পাশাপাশি লেখক বলছি মঞ্চের আলোচনা কিংবা পাঠ উন্মোচনেও প্রাধান্য পাবেন বঙ্গবন্ধু। শিশুদের নিয়ে আয়োজনসহ মেলার সবকিছুতেই সংযুক্ত হবেন শেখ মুজিব।

মুজিববর্ষে গ্রন্থমেলার অঙ্গসজ্জাসহ সার্বিক বিষয়ে একাডেমির পরিচালক ও মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, অনেক কিছুর সঙ্গে মুজিববর্ষে গ্রন্থমেলার পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষকে মেলার মূল থিম ধরে সাজসজ্জায় থাকবে বিশেষত্ব। স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরের নক্সায় বিন্যস্ত হবে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত এই বইমেলা। মেলার বিন্যাসের মাধ্যমে মুজিবের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা হবে। প্রতিদিনের মেলা মঞ্চের আলোচনা-সেমিনার, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, গান, আবৃত্তি, নৃত্যসহ সবকিছুই আবর্তিত হবে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে।

প্রকাশক ও পাঠকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে আগামী বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্বদিকে প্রবেশ ও বহির্গমন পথসহ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে শাহবাগ থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ চলমান থাকায় বইমেলায় প্রবেশে বইপ্রেমীদের প্রতিবন্ধকতা হবে কিনাÑ এ বিষয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মেলা শুরুর আগেই গ্রন্থানুরাগীদের জন্য সড়কপথটি স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের উপযোগী করে তোলা হবে।

মুজিববর্ষে শত বই প্রকাশের বিষয়ে একাডেমির গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক তপন বাগচী জানান, ২০২০ সালের গ্রন্থমেলায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১০০টি বই প্রকাশের কর্মসূচী নেয়া হয়েছে। বাংলা ভাষার পাশাপাশি থাকবে ইংরেজী ভাষায় লেখা বই। ২০২২ সালের গ্রন্থমেলা পর্যন্ত তিন ধাপে প্রকাশিত হবে এসব গ্রন্থ। বইগুলোর অধিকাংশই হবে গবেষণাধর্মী। এসব গ্রন্থের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর বর্ণিল জীবনের নানা বিষয় মেলে ধরা হবে পাঠকের সামনে। তার মধ্যে উঠে আসবে বাংলার রাজনীতির এই মহানায়কের জীবনের অনেক অজানা বিষয়ও। মেলার উদ্বোধনী দিনে প্রকাশিত হবে বঙ্গবন্ধুর নতুন বই ‘নয়াচীন ভ্রমণ’সহ ত্রিশটি বই। বইটি বাংলা ও ইংরেজী দুই ভাষায় প্রকাশিত হবে। এছাড়া বহির্বিশ্বে বঙ্গবন্ধুকে আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপনে প্রকাশ করা হবে গোটা দশেক ইংরেজী বই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফখরুল আলমের মতো ইংরেজী লেখায় পারদর্শী লেখকরা লিখবেন এসব বই। শত বই প্রকাশের এই কর্মসূচীর বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বিভিন্ন লেখকের কাছে পা-ুলিপি চাওয়া হয়েছে। অনেকের পা-ুলিপি জমাও পড়েছে। গবেষক ও লেখকদের নিয়ে গঠিত রিভিউ কমিটির যাচাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে প্রকাশের উপযোগী বইগুলো।

শত বই প্রকাশের কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত কিছু নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে শামসুজ্জামান খানের ‘বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র চিন্তা’, অধ্যাপক হারুন অর রশীদের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল’, রতন লাল চক্রবর্তীর ‘বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়’, অধ্যাপিকা খুরশীদা বেগমের ‘বঙ্গবন্ধু ও নেতৃত্ব’। একাডেমি থেকে লেখকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও বাংলা একাডেমি’, ‘বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্র’, ‘উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু’, ‘কবিতায় বঙ্গবন্ধু’, ‘বঙ্গবন্ধু ও ছাত্র আন্দোলন’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন’। প্রকাশিত হবে বৈশ্বিক মূল্যায়নে জাতির জনকের অবস্থান তুলে ধরা ইংরেজী ভাষার বই ‘বঙ্গবন্ধু এ্যান্ড ওয়ার্ল্ড ভিউ’। সব মিলিয়ে ১০০ বইয়ের মধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পূর্বে প্রকাশিত ১০-১৫টি বইয়ের পুনর্মুদ্রণও থাকছে।। এগুলোর মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর বীরগাথা’ বইটির ইংরেজী অনুবাদ ‘ব্লাড অব হিরো বঙ্গবন্ধু’ নামে প্রকাশ হবে।

নতুন লেখা বিভিন্ন বইয়ের লেখকদের মধ্যে প্রকাশ হবে আসাদ চৌধুরী, ড. নূরুন নবী, শাহজাহান কিবরিয়া, মাহবুব তালুকদারসহ খ্যাতিমান ও তরুণ লেখকদের লেখা বই।

২০২০ সালের ঢাকা লিট ফেস্ট উৎসর্গ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। এ প্রসঙ্গে উৎসবের পরিচালক সাদাফ সায সিদ্দিকী বলেন, ২০২০ সালে মুজিববর্ষে আমাদের উৎসবটি পদার্পণ করবে দশম বছরে। তাই আয়োজনে থাকবে অনেক বর্ণিলতার ছোঁয়া। মুজিববর্ষের উৎসবে বঙ্গবন্ধুকে আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। বিশেষ করে তাকে নিয়ে রচিত মূল্যবান বাংলা বইগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করা হবে। এসব নিয়ে এ বছর থেকেই আমাদের পরিকল্পনা চলছে। পাশাপাশি সাজসজ্জাসহ সব বিভিন্ন বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রাধান্য দিয়ে ২০২০ সালের উৎসব সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। সাহিত্য উৎসবের মাধ্যমে রাঙিয়ে তোলা হবে মুজিববর্ষকে।

দেশের বাইরেও সাহিত্যের আলোয় উদ্যাপিত হবে মুজিববর্ষ। সেই বাস্তবতায় ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার থিম কান্ট্রি হবে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষকে উপজীব্য করে প্রথমবারের মতো এই মেলা কারো নামে উৎসর্গ করা হচ্ছে। সেই মহান মানুষটি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। কলকাতার সেই বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধুকে কিভাবে উপস্থাপন করা হবে- সে বিষয়ে গত ২৯ আগস্ট সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠকও হয়েছে। কলকাতা বইমেলার করণীয় নির্ধারণে সংস্কৃতি সচিব ড. মোঃ আবু হেনা মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলা একাডেমির প্রতিনিধি, সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির প্রতিনিধিসহ বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে এশিয়ার বৃহত্তম এই বইমেলার থিম কান্ট্রি হবে বাংলাদেশ এবং সে বছরই প্রথমবারের মতো গ্রন্থমেলাটি উৎসর্গ করা হবে বঙ্গবন্ধুকে। এটা আমাদের জন্য অনেক গর্ব ও অহঙ্কারের বিষয়। কারণ এর আগে কারো নামে এই বইমেলা উৎসর্গ করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছে সেদেশের আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স এ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড। ২০২০ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

আরো সংবাদ